একাত্তরের প্রথম মুক্তাঞ্চল যশোর এর বিজয়গাঁথা- সাদিয়া সিদ্দিকী মৌ

প্রতি বছর ৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য গৌরবগাথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত হয়েছিল দেশের প্রাচীনতম জেলা যশোর। ঢাকা বিজয়ের ১০ দিন আগেই মুক্তিকামী জনতার গগনবিদারী ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে মুখরিত হয়েছিল যশোরের আকাশ-বাতাস। এটি ছিল রণাঙ্গনের এক গুরুত্বপূর্ণ বিজয়, যা বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামকে চূড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।

প্রারম্ভিক প্রতিরোধ ও জনযুদ্ধ : ১৯৭১ সালের মার্চের শুরু থেকেই যশোর ছিল উত্তাল। ৩ মার্চ শহরের কালেক্টরেট প্রাঙ্গণে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে স্বাধীনতার পথে যাত্রা শুরু হয়। তৎকালীন ইপিআর দপ্তরে ছাত্র, যুবক ও নারীদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হয়। এই সময়েই পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন চারুবালা কর, যিনি স্বাধীনতা সংগ্রামে যশোরের প্রথম শহীদ।

বিদ্রোহ ও হত্যাযজ্ঞ: ৩০ মার্চ যশোর সেনানিবাসের বাঙালি সেনারা ক্যাপ্টেন হাফিজউদ্দীন ও লে. আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। পাকিস্তানি বাহিনী ট্যাংক, কামান ও সাঁজোয়া যান নিয়ে এই বিদ্রোহ দমন করে এবং নিরস্ত্র জনতাকে নির্বিচারে হত্যা করে। পুরো শহর তখন বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছিল।

এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত এই সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন মেজর আবু ওসমান চৌধুরী এবং পরবর্তীতে আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মেজর এম এ মঞ্জুর সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁদের নেতৃত্বে এখানে গেরিলা যুদ্ধের পাশাপাশি নিয়মিত বাহিনীর যুদ্ধ কৌশল প্রয়োগ করা হয়।

চূড়ান্ত আক্রমণ ও বিজয়: জুলাই মাস থেকে শুরু হয় মুক্তিবাহিনীর প্রত্যাঘাতের পালা। উচ্চতর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা যশোর শহরে প্রবেশ করলে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর যাতায়াত তাদের ঘাঁটির মধ্যেই সীমিত হয়ে পড়ে।

মিত্রবাহিনীর অভিযান: ২০ নভেম্বর মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী সম্মিলিতভাবে উত্তর চব্বিশ পরগনার বয়রা সীমান্ত দিয়ে যশোর সেনানিবাস দখলের অভিযান শুরু করে। ২২ নভেম্বর চৌগাছা উপজেলার সলুয়া বাজারের অগ্রবর্তী পাকিস্তানি ঘাঁটির পতন ঘটে। এই যুদ্ধে পাকিস্তানি ১০৭তম ব্রিগেড বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হয়।

হানাদারদের পলায়ন: ৩, ৪ ও ৫ ডিসেম্বর যশোর অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। মিত্রবাহিনী বিমান হামলা ও গোলা নিক্ষেপ করে যশোর সেনানিবাসকে ঘিরে ফেলে। একপর্যায়ে টিকতে না পেরে ৪ ও ৫ ডিসেম্বর রাতে ব্রিগেডিয়ার হায়াত খানের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানি বাহিনী সেনানিবাস ছেড়ে খুলনার দিকে পালিয়ে যায়।

প্রথম মুক্ত জেলা: ৬ ডিসেম্বর ভোরে মিত্রবাহিনীর ট্যাংক রেজিমেন্ট ও মুক্তিবাহিনী যশোর শহরে প্রবেশ করে। দুপুরের মধ্যেই শহর সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত হয়। এই দিনটিতেই প্রথম মুক্ত জেলা হিসেবে যশোরে স্বাধীন বাংলাদেশের রক্ত সূর্যখচিত গাঢ় সবুজ পতাকা উত্তোলন করা হয়।

লড়াকু মুক্তিযোদ্ধারা: যশোরের মুক্তিযুদ্ধে অসংখ্য বীরের জন্ম হয়েছে, যাঁদের আত্মত্যাগে এই বিজয় সম্ভব হয়েছিল। বৃহত্তর যশোর জেলার দুইজন কৃতি সন্তান হলেন ৭ জন বীরশ্রেষ্ঠর মধ্যে অন্যতম। বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ: তিনি তৎকালীন যশোর জেলার (বর্তমান নড়াইল) সন্তান। ১৯৭১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর গোয়ালহাটিতে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন।

অন্যান্য খেতাবপ্রাপ্ত ও শহীদ: খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে রয়েছেন বীর উত্তম নূরুল ইসলাম এবং বীর প্রতীক শফিয়ার রহমান। রণাঙ্গনে যাঁরা প্রাণ দিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে শহীদ সুজাউদ্দৌলা, আসাদুজ্জামান মধু, আব্দুর রাজ্জাক, আবুল হোসেন, রেজাউল ইসলাম, মহিউদ্দিন দেওয়ান, মুন্সি কপিল উদ্দিন, বিশু মণ্ডল, খোকা বারিক, আলতাপ হোসেন, জহির উদ্দিন, হাসান আলী, তাহের আলী, করিমন নেছা, রহিমা খাতুন এবং ভানু বিবির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যশোরের এই বীরত্বপূর্ণ ইতিহাস এবং দেশের প্রথম মুক্তাঞ্চল হওয়ার গৌরব বাঙালি জাতির কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।


Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *