যে আলো জন্ম নেয় প্রতিরোধে : শ্রাবন্তী বারই সুচি

ডিসেম্বরের আকাশ যেন অন্যরকম নীরবতায় ভরে ওঠে। বাতাসে ভাসে এক অদৃশ্য ইতিহাস- প্রতিটি নিঃশ্বাসে মাটির গভীর থেকে উঠে আসে দীর্ঘ প্রতীক্ষার ধ্বনি। রক্তসিক্ত মাটির বুক চিরে জন্ম নেয় অতি শান্ত এক সকালের আলো~ যা কোনো হঠাৎ সূর্যোদয় নয়- এ আলো বহু অন্ধকারের সাধনায় অর্জিত। আকাশ তখন আর কেবল নীল থাকে না- হয়ে ওঠে সাক্ষী; পাখির ডানায় ডানায় বয়ে যায় বিজয়ের অনুচ্চারিত ঘোষণা।

এই দিনে নদীর জল যেন আরও গভীরে তলিয়ে যায় কারণ সে জানে কত অশ্রু একদিন তাকে ভারী করেছিলো। মাঠের ঘাস মাথা নত করে থাকে- পরাজয়ের কাছে নয়, আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধায়।

বাতাস কোনো উল্লাসে চিৎকার করে না; সে ধীরে ধীরে ছুঁয়ে যায় স্মৃতির ক্ষত, যেন বলছে- এই স্বাধীনতা সহজ কিছু নয়~ এর ভারে নত হয় সময়, নীরব হয় বাতাস! মাটির কণায় কণায় জমে থাকে ইতিহাসের ধৈর্য আর সেই ধৈর্যই একদিন রূপ নেয় বিজয়ের নিশ্চুপ দৃঢ়তায়।

রাত্রিগুলো একসময় ছিলো অস্বাভাবিক ভারী। প্রাণহীন বাতাসে ছিলো বারুদের গন্ধ, পোড়া ঘরের দীর্ঘশ্বাস। অন্ধকারের পক্ষে দাঁড়িয়ে কিছু মানুষ সেদিন মনুষ্যত্বকে বিসর্জন দিয়েছিলো।

তাদের মস্তিষ্ক খুবলে খেয়েছিলো বিশ্বাসঘাতকতা। নিজের মাটির বিপক্ষে দাঁড়িয়ে তারা খুলে দিয়েছিলো নরকদ্বার। তাদের দেখানো পথে নেমে এসেছিলো হিংস্রতা- ঠান্ডা ও পরিকল্পিত নিষ্ঠুরতা! পাকিস্তানি নৃশংসতা তখন আর যুদ্ধ ছিলো না~ হয়ে উঠেছিলো শিকার। নিস্তব্ধ গ্রাম ছিঁড়ে উঠেছিলো গুলির শব্দে, আগুনে পুড়েছিলো ঘর আর আকাশ নির্বাক হয়ে দেখেছিলো মানুষকে মানুষের হাতে ছিন্নভিন্ন হতে! বাতাস বোধহয় থমকে গিয়েছিলো কারণ সে বহন করতে পারছিলো না সেই গগণবিদারী আর্তনাদ।

নদী সেদিন কেবল জল বহন করেনি- সে বয়ে নিয়ে গিয়েছিলো ছিন্ন স্বপ্ন, নিথর দেহ আর অব্যক্ত অভিশাপ। মাঠ ঢেকে গিয়েছিলো রক্তে, বাতাস ভারী হয়েছিলো আর্তচিৎকারে।

বিশ্বাসঘাতকদের পায়ের নিচে পিষ্ট হয়েছিল মানবতা, কলুষিত হয়েছিলো বাংলার পথ; তাদের ইশারায় ট্রিগার টেনেছিলো দানবেরা। ইতিহাস আজও সেই দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নেয়!

আর ঠিক সেই ঘোর অন্ধকারেই দাঁড়িয়ে ছিলো কিছু মানুষ নগ্ন হাতে, অনাহারে, তবুও অদম্য- যাদের অস্ত্র ছিল বিশ্বাস। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও ভয় তাঁদের কাবু করতে পারেনি।

তাদের বুকের রক্তে ধুয়ে গিয়েছিলো বিশ্বাসঘাতকতার কালো দাগ। যা জানান দেয় এই মাটি কেবল সহ্য করেনি- জন্ম দিয়েছে প্রতিরোধ! তাঁদের রক্তের স্বাক্ষরে প্রতিফলিত হয়েছিলো এক অমঘো সত্য- এই মাটি হত্যা মানলেও আত্মসমর্পণ জানে না।

বাংলাদেশের বিজয় তাই কেবল একটি দিন নয়- এ এক গভীর ঋতু যা প্রতি বছর ফিরে এসে মনে করিয়ে দেয়- আলো আপনাআপনি আসে না।

অন্ধকারকে অতিক্রম করেই তাকে জন্ম নিতে হয়! আর সেই আলোয় আজও পাখি উড়ে, বাতাস বয়ে চলে, আকাশ বিস্তৃত থাকে- নীরবে, গাম্ভীর্যে অথচ অপরিসীম গর্বে।

লেখক-
শ্রাবন্তী বারই সুচি
শিক্ষার্থী ও সংস্কৃতিকর্মী

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *